সাহিত্যে খেলা

সাহিত্যে খেলা

প্রমথ চৌধুরী


লেখক পরিচিতি:

প্রকৃত নাম : প্রমথ চৌধুরী

ছদ্মনাম : বীরবল

জন্ম ও পরিচয় : ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই আগস্ট যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস পাবনা জেলার হরিপুর গ্রামে।

পিতা : দুর্গাদাস চৌধুরী।

শিক্ষাজীবন :  তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বি.এ. (অনার্স) দর্শন, ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে এম.এ. ডিগ্রী লাভ করেন এবং লন্ডন থেকে বার এট-ল পাস করেন।

কর্মজীবন : কিছুকাল ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন এবং পরে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন।

সাহিত্যকর্ম

প্রবন্ধগ্রন্থ : তেল-নুন-লাকড়ী, বীরবলের হালখাতা, নানকথা, আমাদের শিক্ষা, রায়তের কথা, প্রবন্ধ সংগ্রহ ইত্যাদি। 

গল্পগ্রন্থ : চার ইয়ারী কথা, আহুতি, নীললোহিত, গল্পসংগ্রহ প্রভৃতি।

কাব্যগ্রন্থ : সনেট পঞ্চাশৎ, পদচারণ।


বিশেষ কৃতিত্ব : তিনি বাংলা গদ্যসাহিত্যে চলিত রীতি এবং কাব্যসাহিত্যে ইতালীয় সনেটের প্রবর্তন করেন। পুরস্কারকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত 'জগত্তারিণী স্বর্ণপদক' লাভ।

জীবনাবসান : ১৯৪৬ সালে ২রা সেপ্টেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।




জগৎ-বিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁ, যিনি নিতান্ত জড় প্রস্তরের দেহ থেকে অসংখ্য জীবিতপ্রায় দেবদানব কেটে বার করেছেন তিনিও শুনতে পাই, যখন তখন হাতে কাদা নিয়ে, আঙুলের টিপে মাটির পুতুল ত'য়ের করে থাকেন।🔒ব্যাখ্যা এই পুতুল গড়া হচ্ছে তাঁর খেলা। 🔒ব্যাখ্যা শুধু রোদ্যাঁ কেন, পৃথিবীর শিল্পী মাত্রেই এই শিল্পের খেলা খেলে থাকেন। 🔒ব্যাখ্যা যিনি গড়তে জানেন, তিনি শিবও গড়তে পারেন, বাঁদরও গড়তে পারেন। 🔒ব্যাখ্যা আমাদের সঙ্গে বড় বড় শিল্পীদের তফাত এইটুকু 🔒ব্যাখ্যা যে, তাদের হাতে এক করতে আর হয় না। সম্ভবত এই কারণে কলারাজ্যের মহাপুরুষদের যা-খুশি তাই করবার যে অধিকার আছে, ইতর শিল্পীদের সে অধিকার নেই। স্বর্গ হতে দেবতারা মধ্যে মধ্যে ভূতলে অবতীর্ণ হওয়াতে কেউ আপত্তি করেন না, কিন্তু মর্তবাসীদের পক্ষে রসাতলে গমন করাটা বিশেষ নিন্দনীয়। অথচ একথা অস্বীকার করবার জো নেই যে, যখন এ জগতে দশটা দিক আছে তখন সেই সব দিকেই গতায়াত করবার প্রবৃত্তিটি মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক। মন উঁচুতেও উঠতে চায়, নিচুতেও নামতে চায়। 🔒ব্যাখ্যা বরং সত্য কথা বলতে গেলে সাধারণ লোকের মন স্বভাবতই যেখানে আছে তারই চারপাশে ঘুরে বেড়াতে চায়, উড়তেও চায় না ডুবতেও চায় না। কিন্তু সাধারণ লোকে সাধারণ লোককে কী ধর্ম, কী নীতি, কী কাব্য, সকল রাজ্যেই অহরহ ডানায় ভর দিয়ে থাকতেই পরামর্শ দেয় । একটু উঁচুতে না চড়লে আমরা দর্শক এবং শ্রোতৃমণ্ডলীর নয়ন মন আকর্ষণ করতে পারি নে। 🔒ব্যাখ্যা বেদীতে না বসলে আমাদের উপদেশ কেউ মানে না। 🔒ব্যাখ্যা রঙ্গমঞ্চে না চড়লে আমাদের অভিনয় কেউ দেখে না, 🔒ব্যাখ্যা আর কাষ্ঠমঞ্চে না দাঁড়ালে আমাদের বক্তৃতা কেউ শোনে না। সুতরাং জনসাধারণের চোখের সম্মুখে থাকবার লোভে আমরাও অগত্যা চব্বিশ ঘণ্টা টঙে চড়ে থাকতে চাই, 🔒ব্যাখ্যা কিন্তু পারি নে। অনেকের পক্ষে নিজেদের আয়ত্তের বহির্ভূত উচ্চস্থানে ওঠবার চেষ্টাটাই মহাপতনের কারণ হয়। 🔒ব্যাখ্যা এসব কথা বলবার অর্থ এই যে, কষ্টকর হলেও আমাদের পক্ষে অবশ্য মহাজনদের পথ অনুসরণ করাই কর্তব্য। কিন্তু ডাইনে-বাঁয়ে ছোটখাট গলিঘুঁজিতে খেলাচ্ছলে প্রবেশ করবার যে অধিকার তাদের আছে, সে অধিকারে আমরা কেন বঞ্চিত হব। গান করতে গেলেই যে সুর তারায় চড়িয়ে রাখতে হবে, কবিতা লিখতে হলেই যে মনের শুধু গভীর ও প্রখর ভাব প্রকাশ করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম থাকা উচিত নয়। শিল্পরাজ্যে খেলা করবার প্রবৃত্তির ন্যায় অধিকারও বড়-ছোট সকলের সমান আছো ৷ 🔒ব্যাখ্যা এমনকি, একথা বললেও অত্যুক্তি হয় না যে, এ পৃথিবীতে একমাত্র খেলার ময়দানে ব্রাহ্মণশূদ্রের প্রভেদ নেই। 🔒ব্যাখ্যা রাখাল ছেলের সঙ্গে দরিদ্রের ছেলেরও খেলায় যোগ দেবার অধিকার আছে। আমরা যদি একবার সাহস করে কেবলমাত্র খেলা করবার জন্য সাহিত্যজগতে প্রবেশ করি, 🔒ব্যাখ্যা তাহলে নির্বিবাদে সে জগতের রাজ-রাজড়ার দলে মিশে যাব। 🔒ব্যাখ্যা কোনোরূপ উচ্চ আশা নিয়ে সে ক্ষেত্রে উপস্থিত হলেই নিম্নশ্রেণিতে পড়ে যেতে হবে।

লেখকেরাও অবশ্য দশের কাছে হাততালির প্রত্যাশা রাখেন, বাহবা না পেলে মনঃক্ষুণ্ণ হন। কেননা তারাই হচ্ছেন যথার্থ সামাজিক জীব, 🔒ব্যাখ্যা বাদবাকি সকলে কেবলমাত্র পারিবারিক। বিশ্বমানবের মনের সঙ্গে নিত্য নূতন | সম্বন্ধ পাতানোই হচ্ছে কবিমনের নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম। 🔒ব্যাখ্যা এমনকি, কবির আপন মনের গোপন কথাটিও গীতিকবিতাতে রঙ্গভূমিস্বগতোক্তি স্বরূপেই উচ্চারিত হয়, যাতে করে সেই মর্মকথা হাজার লোকের কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু উচ্চমঞ্চে আরোহণ করে উচ্চৈঃস্বরে উচ্চবাক্য না করলে যে জনসাধারণের নয়ন-মন আকর্ষণ করা যায় না, এমন কোনো কথা নেই। সাহিত্যজগতে যাঁদের খেলা করবার প্রবৃত্তি আছে, সাহস আছে, ক্ষমতা আছে, মানুষের নয়ন-মন আকর্ষণ করবার সুযোগ বিশেষ করে তাদের কপালেই ঘটে। মানুষ যে খেলা দেখতে ভালোবাসে তার পরিচয় তো আমরা জড় সমাজেও নিত্য পাই । টাউনহলে বক্তৃতা শুনতেই বা ক'জন যায় আর গড়ের মাঠে ফুটবল খেলা দেখতেই বা ক'জন যায়। 🔒ব্যাখ্যা অথচ এ কথাও সত্য যে, টাউনহলের বক্তৃতার উদ্দেশ্য অতি মহৎ, আর গড়ের মাঠের খেলোয়াড়দের ছুটোছুটি, দৌড়াদৌড়ি আগাগোড়া অর্থশূন্য এবং উদ্দেশ্যবিহীন। আসল কথা এই যে, মানুষের দেহমনের সকল প্রকার ক্রিয়ার মধ্যে ক্রীড়া শ্রেষ্ঠ, 🔒ব্যাখ্যা কেননা তা উদ্দেশ্যহীন । মানুষে যখন খেলা করে, তখন সে এক আনন্দ ব্যতীত অপর কোনো ফলের আকাঙ্ক্ষা রাখে না। যে খেলার ভিতর আনন্দ নেই কিন্তু উপরি পাওনার আশা আছে, তার নাম খেলা নয়, , জুয়াখেলা। 🔒ব্যাখ্যা এবং যেহেতু খেলার আনন্দ নিরর্থক অর্থাৎ অর্থগত নয়, সে কারণে তা কারও নিজস্ব হতে পারে না। এ আনন্দে সকলেরই অধিকার সমান।

সুতরাং সাহিত্যে খেলা করবার অধিকার যে আমাদের আছে, শুধু তাই নয়, স্বার্থ এবং পরার্থ এ দুয়ের যুগপৎ সাধনের জন্য মনোজগতে খেলা করাই হচ্ছে আমাদের পক্ষে সর্বপ্রধান কর্তব্য । যে লেখক সাহিত্য ক্ষেত্রে ফলের চাষ করতে ব্রতী হন, যিনি কোনোরূপ কার্য-উদ্ধারের অভিপ্রায়ে লেখনী ধারণ করেন, তিনি গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্মও বোঝেন না। 🔒ব্যাখ্যা কেননা খেলা হচ্ছে জীবজগতে একমাত্র নিষ্কাম কর্ম, 🔒ব্যাখ্যা অতএব মোক্ষলাভের একমাত্র উপায়। স্বয়ং ভগবান বলেছেন, যদিচ তার কোনোই অভাব নেই তবুও তিনি এই বিশ্ব সৃজন করেছেন, অর্থাৎ সৃষ্টি তাঁর লীলামাত্র । কবির সৃষ্টিও এই বিশ্ব সৃষ্টির অনুরূপ, 🔒ব্যাখ্যা সে সৃজনের মূলে কোনো অভাব দূর করবার অভিপ্রায় নেই—সে সৃষ্টির মূল অন্তরাত্মার স্ফূর্তি আর তার ফল আনন্দ। এক কথায় সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র এবং সে লীলা বিশ্বলীলার অন্তর্ভূত; কেননা জীবাত্মা পরমাত্মার অঙ্গ এবং অংশ। 🔒ব্যাখ্যা সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, 🔒ব্যাখ্যা কারও মনোরঞ্জন করা নয়। 🔒ব্যাখ্যা এ দুয়ের ভিতর যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ আছে, সেইটি ভুলে গেলেই লেখকেরা নিজে খেলা না করে পরের জন্যে খেলনা তৈরি করতে বসেন।

সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য যে স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে, 🔒ব্যাখ্যা তার প্রমাণ বাংলাদেশে আজ দুর্লভ নয়। কাব্যের ঝুমঝুমি, বিজ্ঞানের চুষিকাঠি, দর্শনের বেলুন, রাজনীতির রাঙালাঠি, ইতিহাসের ন্যাকড়ার পুতুল, 🔒ব্যাখ্যা নীতির টিনের ভেঁপু এবং ধর্মের জয়ঢাক—এইসব জিনিসে সাহিত্যের বাজার ছেয়ে গেছে। সাহিত্যরাজ্যে খেলনা পেয়ে পাঠকের মনতুষ্টি হতে পারে, কিন্তু তা গড়ে লেখকের মনতুষ্টি হতে পারে না। কারণ পাঠক সমাজ যে খেলনা আজ আদর করে, কাল সেটিকে ভেঙে ফেলে। 🔒ব্যাখ্যা সে প্রাচ্যই হোক আর পাশ্চাত্যই হোক, কাশীরই হোকআর জার্মানিরই হোক দুদিন ধরে তা কারও মনোরঞ্জন করতে পারে না। আমি জানি যে, পাঠক সমাজকে আনন্দ দিতে গেলে তারা প্রায়শই বেদনা বোধ করে থাকেন। কিন্তু এতে ভয় পাবার কিছুই নেই; কেননা কাব্যজগতে যার নাম আনন্দ, তারই নাম বেদনা। 🔒ব্যাখ্যা

অপর পক্ষে এ যুগে পাঠক হচ্ছে জনসাধারণ, সুতরাং তাদের মনোরঞ্জন করতে হলে আমাদের অতি সস্তা খেলনা 🔒ব্যাখ্যা গড়তে হবে, নইলে তা বাজারে কাটবে না। এবং সস্তা করার অর্থ খেলো করাবৈশ্য লেখকের পক্ষেই শূদ্র পাঠকের মনোরঞ্জন করা সংগত। অতএব সাহিত্যে আর যাই কর-না কেন, পাঠক সমাজের মনোরঞ্জন করবার চেষ্টা কোরো না। 🔒ব্যাখ্যা

তবে কি সাহিত্যের উদ্দেশ্য লোককে শিক্ষা দেওয়া? অবশ্য নয়। 🔒ব্যাখ্যা কেননা কবির মতিগতি শিক্ষকের মতিগতির সম্পূর্ণ বিপরীত 🔒ব্যাখ্যা স্কুল না বন্ধ হলে যে খেলার সময় আসে না, এ তো সকলেরই জানা কথা । কিন্তু সাহিত্য রচনা যে আত্মার লীলা, এ কথা শিক্ষকেরা স্বীকার করতে প্রস্তুত নন। 🔒ব্যাখ্যা সুতরাং শিক্ষা ও সাহিত্যের ধর্মকর্ম যে এক নয়, এ সত্যটি একটু স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেওয়া আবশ্যক। প্রথমত শিক্ষা হচ্ছে সেই বস্তু যা লোকে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলাধঃকরণ করতে বাধ্য হয়, অপর পক্ষে কাব্যরস লোকে শুধু স্বেচ্ছায় নয়, সানন্দে পান করে; কেননা শাস্ত্রমতে সে রস অমৃত। 🔒ব্যাখ্যা দ্বিতীয়ত শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মনকে বিশ্বের খবর জানানো, সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো; 🔒ব্যাখ্যা কাব্য যে সংবাদপত্র নয়, একথা সকলেই জানেন। তৃতীয়ত অপরের মনের অভাব পূর্ণ করবার উদ্দেশ্যেই শিক্ষকের হস্তে শিক্ষা জন্মলাভ করেছে, কিন্তু কবির নিজের মনের পরিপূর্ণতা হতেই সাহিত্যের উৎপত্তি। সাহিত্যের উদ্দেশ্য যে আনন্দদান করা, শিক্ষা দান করা নয়, একটি উদাহরণের সাহায্যে তার অকাট্য প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে।

বাল্মীকি আদিতে মুনি-ঋষিদের জন্য রামায়ণ রচনা করেছিলেন, জনগণের জন্য নয়। 🔒ব্যাখ্যা এ কথা বলা বাহুল্য যে, বড় বড় মুনি-ঋষিদের কিঞ্চিৎ শিক্ষা দেওয়া তার উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু রামায়ণ শ্রবণ করে মহর্ষিরাও যে কতদূর আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন তার প্রমাণ তাঁরা কুশীলবকে তাঁদের যথাসর্বস্ব, এমনকি কৌপীন পর্যন্ত পেলা দিয়েছিলেন। রামায়ণ কাব্য হিসেবে যে অমর এবং জনসাধারণ আজও যে তার শ্রবণে পঠনে আনন্দ উপভোগ করে তার একমাত্র কারণ, আনন্দের ধর্মই এই যে তা সংক্রামক। 🔒ব্যাখ্যা অপর পক্ষে লাখে একজনও যে যোগবশিষ্ঠ রামায়ণের ছায়া মাড়ান না তার কারণ, সে বস্তু লোককে শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল, আনন্দ দেবার জন্য নয়। আসল কথা এই যে, সাহিত্য কস্মিনকালেও স্কুলমাস্টারির ভার নেয়নি। এতে দুঃখ করবার কোনো কারণ নেই। দুঃখের বিষয় এই যে, স্কুলমাস্টারেরা একালে সাহিত্যের ভার নিয়েছেন।

কাব্যরস নামক অমৃতে যে আমাদের অরুচি জন্মেছে, 🔒ব্যাখ্যা তার জন্য দায়ী এ যুগের স্কুল এবং তার মাস্টার। কাব্য পড়বার ও বোঝবার জিনিস, কিন্তু স্কুলমাস্টারের কাজ হচ্ছে বই পড়ানো ও বোঝানো। লেখক এবং পাঠকদের মধ্যে এখন স্কুলমাস্টার দণ্ডায়মান। 🔒ব্যাখ্যা এই মধ্যস্থদের কৃপায় আমাদের সঙ্গে কবির মনের মিলন দূরে থাক, চার চক্ষুর মিলনও ঘটে না। স্কুলঘরে আমরা কাব্যের রূপ দেখতে পাই নে, 🔒ব্যাখ্যা শুধু তার গুণ শুনি। টীকা-ভাষ্যের প্রসাদে আমরা কাব্য সম্বন্ধে সকল নিগূঢ় তত্ত্ব জানি, কিন্তু সে কী বস্তু তা চিনিনে। আমাদের শিক্ষকদের প্রসাদে আমাদের এ জ্ঞান লাভ হয়েছে যে, পাথুরে কয়লা হীরার সবর্ণ না হলেও সগোত্র; অপর পক্ষে হীরক ও কাচ যমজ হলেও সহোদর নয়। এর একের জন্ম পৃথিবীর গর্ভে অপরটি | মানুষের হাতে; এবং এ উভয়ের ভিতর এক দা-কুমড়ার সম্বন্ধ ব্যতীত অপর কোনো সম্বন্ধ নেই। অথচ এত জ্ঞান সত্ত্বেও আমরা সাহিত্যে কাচকে হীরা এবং হীরাকে কাচ বলে নিত্য ভুল করি, এবং হীরা ও কয়লাকে একশ্রেণিভুক্ত করতে| তিলমাত্র দ্বিধা করিনে, কেননা ওরূপ করা যে সঙ্গত তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আমাদের মুখস্থ আছে | সাহিত্য শিক্ষার ভার নেয় না, 🔒ব্যাখ্যা কেননা মনোজগতে শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কবির কাজের ঠিক উলটো। 🔒ব্যাখ্যা কারণ কবির কাজ হচ্ছে কাব্য সৃষ্টি করা, আর শিক্ষকের কাজ হচ্ছে প্রথমে তা বধ করা, তারপরে তার শবচ্ছেদ করা, এবং ঐ উপায়ে তার তত্ত্ব আবিষ্কার করা ও প্রচার করা । এই সব কারণে নির্ভয়ে বলা যেতে পারে যে, কারও মনোরঞ্জন করাও সাহিত্যের কাজ নয় । কাউকে শিক্ষা দেওয়াও নয়। সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়। 🔒ব্যাখ্যা

বিচারের সাহায্যে এই মাত্রই প্রমাণ করা যায়। তবে বস্তু যে কী, তার জ্ঞান অনুভূতিসাপেক্ষ তর্কসাপেক্ষ নয়। সাহিত্যে মানবাত্মা খেলা করে এবং সেই খেলার আনন্দ উপভোগ করে। এ কথার অর্থ যদি স্পষ্ট না হয় তাহলে কোনো সুদীর্ঘ ব্যাখ্যার দ্বারা তা স্পষ্টতর করা আমার অসাধ্য।

এই সব কথা শুনে আমার জনৈক শিক্ষাভক্ত বন্ধু এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, সাহিত্য খেলাচ্ছলে শিক্ষা দেয়।

উত্তর : বাংলা সাহিত্যে চলিত গদ্যরীতির প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরী।

উত্তর : প্রমথ চৌধুরী পরিশীলত বাগবৈদগ্ধ্যময় রম্যরচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

উত্তর : রবীন্দ্রনাথসহ সমকালীন বিখ্যাত মননশীল লেখকদের অনেকেই ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার লেখক ছিলেন?

উত্তর : প্রমথ চৌধুরীর ছদ্মনাম ‘বীরবল’।

উত্তর : বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষারীতির প্রথম মুখপত্র হিসেবে পরিচিত পত্রিকাটির নাম ‘সবুজপত্র’।

উত্তর : প্রশ্নোক্ত উক্তিটি বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর শিল্পচর্চার পন্থা সম্পর্কে ইঙ্গিত দিতে বলা হয়েছে।
মূলত শিল্পীর খেলার মাধ্যমেই শিল্পরাজ্যের সব অক্ষয় সৃষ্টির জন্ম। শিল্প সৃষ্টিতে শিল্পীর মনের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দেরই প্রকাশ ঘটে। শিল্প সৃষ্টির উপাদান নিয়ে শিল্পী খেলায় মেতে থাকেন। আর এই খেলার ফলেই তাঁর সৃষ্টি-কর্ম নানা অবয়ব পায়। ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর শিল্প সৃষ্টির উদাহরণ টেনেছেন। কাদামাটি নিয়ে মনের আনন্দে খেলাচ্ছলে তিনি বহু বিখ্যাত সৃষ্টির জন্ম দিয়েছেন।

উত্তর : শিল্পীর খেলার মাধ্যমেই শিল্পরাজ্যের সব অক্ষয় সৃষ্টির জন্ম- লেখকের এই মনোভাবই ব্যক্ত হয়েছে আলোচ্য উক্তির মাধ্যমে।
লেখকের মতে, শিল্প সৃষ্টিতে শিল্পীর মনের আনন্দেরই প্রকাশ ঘটে। শিল্প সৃষ্টির উপাদান নিয়ে শিল্পী খেলায় মেতে থাকেন। আর এই লেখার ফলেই তার সৃষ্টিকর্ম নানান অবয়ব পায়। ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধের রচয়িতা প্রমথ চৌধুরী তাঁর রচনায় ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর শিল্পসৃষ্টির উদাহরণ টেনেছেন। কাদামাটি নিয়ে পুতুল গড়া খেলার মাধ্যমেই তাঁর সব বিখ্যাত সৃষ্টির জন্ম হয়েছে। আর এই খেলাই হলো পৃথিবীর সব সৃজনশীল কর্মের মূল।

উত্তর : পৃথিবীর সকল শিল্পীরই শিল্প সৃষ্টির প্রয়াসকে ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধের লেখক খেলা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
লেখক মত প্রকাশ করেছেন যে, শিল্পী যা কিছু সৃষ্টি করেন সেটি শিল্পীর কাছে একরকম খেলারই নামান্তর। বিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর সৃষ্টিকর্মকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। মাটি নিয়ে পুতুল গড়ার খেলা খেলেই পৃথিবী জোড়া খ্যাতি পেয়েছেন রোদ্যাঁ। ঠিক তেমনই পৃথিবীর সকল শিল্পীই খেলার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অভিনব সব সৃষ্টিশীল শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে যাচ্ছেন।

উত্তর : শিল্পরাজ্যে শিল্পীর রয়েছে অবাধ অধিকার, তাই নিজের সৃষ্টিকর্মকে তিনি খেলাচ্ছলে যেকোনো রূপ প্রদান করতে পারেন।
পৃথিবীর সকল শিল্পীই এরকম খেলার মাধ্যমে নিজ নিজ শিল্পের সাধনা করেন। এই খেলা করার অধিকার থাকার কারণেই তাঁদের সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক বিকাশ সম্ভব হয়ে ওঠে। তাই শিল্পী তাঁর সৃষ্টকর্মে আনতে পারেন নানা মাত্রিকতা। তাঁর শিল্পকর্ম যেমন শিবের আকৃতি পেতে পারে তেমনি সেটি আবার বাঁদরের অবয়বও পেতে পারে। তবে যাই তিনি সৃষ্টি করেন না কেন তাই হয়ে উঠে শিল্পময়।

উত্তর : আমাদের সঙ্গে বড় বড় শিল্পীদের তফাত এইটুকু যে, তাঁদের হাতে এক করতে আরেক হয় না।
‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধে লেখক বলেছেনÑ যারা বড় মাপের শিল্পী হন তাঁরা একটু ব্যতিক্রমী হন। যেমনটা ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁ। তিনি নিতান্ত জড়প্রস্তরের দেহ থেকে অসংখ্য জীবিতপ্রায় দেব-দানব কেটে বের করেছেন এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের ভাস্কর্য তৈরি করে বিশ^বিখ্যাত ভাস্করশিল্পী হয়েছেন। তাঁর আঙুলের টিপে তিনি কাদাকে পুতুল বানাতে চেয়েছেন বলে পুতুলই তৈরি হয়েছে। অথচ আমরা কাদা দিয়ে পুতুল বানাতে গেলে হয়তো পুতুল না হয়ে তা অন্যকিছু হয়ে যাবে। বড় বড় শিল্পীদের সঙ্গে আমাদের তফাত এখানেই।

Score Board





































i. খবর প্রদান         
ii. পাঠকের মনতুষ্টি      
iii. মুখস্থবিদ্যা
নিচের কোনটি সঠিক?
























Score Board