বিদ্রোহী
কাজী নজরুল ইসলাম
কবি-পরিচিতি:
কবি: কাজী নজরুল ইসলাম
জন্ম: ২৫ মে, ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দ (১১ জৈষ্ঠ, ১৩০৬ সাল)। জন্মস্থান: বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চরুলিয়া গ্রাম। পিতার নাম: কাজী ফকির আহমদ। মাতার নাম: জাহেদা খাতুন শিক্ষাজীবন
প্রাথমিক শিক্ষা: গ্রামের মক্তব থেকে প্রাথমিক শিক্ষালাভ। মাধ্যমিক: প্রথমে রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল স্কুল, পরে মারখুন উচ্চ ইংরেজি স্কুল, সর্বশেষ ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। কর্মজীবন/ পেশা: প্রথম জীবনে জীবিকার তাগিদে তিনি কবি-দলে, রুটির দোকানে এবং সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীকালে পত্রিকা সম্পাদনা, গ্রামোফোন রেকর্ডের ব্যবসায় গান লেখা ও সুরারোপ এবং সাহিত্য সাধনা।
সাহিত্যকর্ম :
কাব্যগ্রন্থ: অগ্নি-বীণা, বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণি-মনসা, জিঞ্জির, সন্ধ্যা, প্রলয়-শিখা, দোলনচাঁপা, ছায়ানট, সিন্ধু-হিন্দোল, চক্রবাক।
► কাব্যগ্রন্থ মনে রাখার কৌশল: সন্ধ্যার বিশের বাঁশি শুনে সাম্যবাদী সর্বহারাটি জিঞ্জির ভেঙ্গে ভাঙ্গার গান গেয়ে প্রলয়শিখা
জ্বেলে দিলো, মনে হলো ফণিমনসা ফণা তুলে অগ্নিবীণা বাজালো।
উপন্যাস: বাঁধনহারা, মৃত্যু-ক্ষুধা, কুহেলিকা।
► উপন্যাস মনে রাখার কৌশল: কুহেলিকা মৃত্যুক্ষুধায় বাঁধন-হারা হয়ে গেল।
গল্প: ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, শিউলিমালা, পদ্মগোখরা, জিনের বাদশা।
► গল্পগ্রন্থ মনে রাখার কৌশল: শিউলিমালা ব্যথার দান রিক্তের বেদনে ঝরে গেল।
নাটক: আলেয়া, ঝিলিমিলি,পুতুলের বিয়ে।
► নাটক মনে রাখার কৌশল : আলেয়া আর ঝিলমিল পুতুলের বিয়ে দিচ্ছে।
প্রবন্ধগ্রন্থ: যুগ-বাণী, দুর্দিনের যাত্রী, রাজবন্দীর জবানবন্দী, ধূমকেতু।
জীবনীগ্রন্থ: মরুভাস্কর [হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর জীবনীগ্রন্থ]।
অনুবাদ: রুবাইয়াত-ই-হাফিজ, রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম।
গানের সংকলন: বুলবুল, চোখের চাতক, চন্দ্রবিন্দু, নজরুল গীতি, সুরলিপি, গানের মালা, চিত্তনাম ইত্যাদি।
সম্পাদিত পত্রিকা: ধূমকেতু, লাঙ্গল, দৈনিক নবযুগ।
কাজী নজরুল ইসলামের নিষিদ্ধ গ্রন্থসমূহ
যুগবাণী: এটি ছিল নজরুলের প্রথম নিষিদ্ধ গ্রন্থ। ব্রিটিশ সরকার ১৯২২ সালে ফৌজদারি বিধির ৯৯এ ধারা অনুযায়ী এটি বাজেয়াপ্ত করে।
বিষের বাঁশি : এটি ছিল নজরুলের দ্বিতীয় নিষিদ্ধ গ্রন্থ এবং প্রথম নিষিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ।
ভাঙার গান : এই কাব্যগ্রন্থটিও ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়।
প্রলয় শিখা : এটিও নজরুলের একটি নিষিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ।
চন্দ্রবিন্দু : এটিও নজরুলের একটি নিষিদ্ধ গ্রন্থ।
কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম রচনাসমূহ
প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থের নাম: ‘ব্যাথার দান’ (প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯২২)।
প্রথম প্রকাশিত রচনা: ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ (প্রকাশ: জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬; সওগাত)।
প্রথম প্রকাশিত কবিতা: ‘মুক্তি’ (প্রকাশ: শ্রাবণ ১৩২৬; বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা)।
প্রথম প্রকাশিত গল্প: ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ (প্রকাশ: জ্যৈষ্ঠ: ১৩২৬)।
প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: ‘ব্যথার দান’ (প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯২২)।
প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: ‘অগ্নি-বীণা’ (সেপ্টেম্বর, ১৯২২)।
প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস: ‘বাঁধন হারা’ (১৯২৭)।
প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ: ‘তুর্কিমহিলার ঘোমটা খোলা’ (প্রকাশ: কার্তিক ১৩২৬)।
প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ: ‘যুগবাণী’ (অক্টোবর ১৯২২)।
পুরস্কার/ সম্মাননা:কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’; ভারত সরকার প্রদত্ত ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি লাভ। রবীন্দ্রভারতী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় কবিকে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। তাছাড়া ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার কবিকে ‘একুশে পদক’ প্রদান এবং জাতীয় কবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন।
জীবনাবাসন মৃত্যু তারিখ: ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট।
সমাধিস্থান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ।
উৎস পরিচিতি
‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কবির ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। এটি কবির প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতাটিই ‘বিদ্রোহী’।
গঠনাঙ্গিক
কবিতাটি ১৪০টি পঙক্তির একটি দীর্ঘ কবিতা। কবিতাটিতে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার করা হয়েছে, তবে প্রচলিত অক্ষরবৃত্ত ছন্দের থেকে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
প্রথম ও শেষ চরণ
প্রথম চরণ: বল বীর-
শেষ চরণ: বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!
বল বীর –
বল উন্নত মম শির! 🔒ব্যাখ্যা
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির! 🔒ব্যাখ্যা
আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!🔒ব্যাখ্যা
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর, 🔒ব্যাখ্যা
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার! 🔒ব্যাখ্যা
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল, 🔒ব্যাখ্যা
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল! 🔒ব্যাখ্যা
আমি মানি না কো কোন আইন, 🔒ব্যাখ্যা
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন! 🔒ব্যাখ্যা
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!🔒ব্যাখ্যা
বল বীর –
চির-উন্নত মম শির! 🔒ব্যাখ্যা
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান, 🔒ব্যাখ্যা
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর রণ-তূর্য;🔒ব্যাখ্যা
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস, 🔒ব্যাখ্যা
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ! 🔒ব্যাখ্যা
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার, 🔒ব্যাখ্যা
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার,
আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দন্ড,
আমি চক্র ও মহা শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচন্ড! 🔒ব্যাখ্যা
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য, 🔒ব্যাখ্যা
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব। 🔒ব্যাখ্যা
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের, 🔒ব্যাখ্যা
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ – জ্বালা, প্রিয় লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের 🔒ব্যাখ্যা
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি! 🔒ব্যাখ্যা
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী, 🔒ব্যাখ্যা
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝঝুম
মম বাঁশরীর তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার 🔒ব্যাখ্যা
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার! 🔒ব্যাখ্যা
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে 🔒ব্যাখ্যা
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত, 🔒ব্যাখ্যা
যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না – 🔒ব্যাখ্যা
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
আমি চির-বিদ্রোহী বীর – 🔒ব্যাখ্যা
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির! (সংক্ষেপিত)
পাঠ-পরিচিতি
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত “বিদ্রোহী” কবিতাটি কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবাণী’ (১৯২২) থেকে সংকলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা “বিদ্রোহী”। “বিদ্রোহী” বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা। রবীন্দ্রযুগে এ কবিতার মধ্য দিয়ে এক প্রাতিম্বিক কবিকণ্ঠের আত্মপ্রকাশ ঘটে- যা বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক বিরল স্মরণীয় ঘটনা। ‘‘বিদ্রোহী” কবিতায় আত্মজাগরণে উন্মুখ কবির সদয় আত্মপ্রকাশ ঘোষিত হয়েছে। বিদ্রোহী- কাজী নজরুল ইসলাম কবিতায় সগর্বে কবি নিজের বিদ্রোহী কবিসত্তার প্রকাশ ঘটিয়ে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের শাসকদের শাসন ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেন। এ কবিতায় সংযুক্ত রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কবির ক্ষোভ ও বিদ্রোহ। কবি সকল অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে গিয়ে। বিভিন্ন ধর্ম, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও পুরাণের শক্তি উৎস থেকে উপকরণ উপাদান সমীকৃত করে নিজের বিদ্রোহী সত্তার অবয়ব রচনা করেন। কবিতার শেষে ধ্বনিত হয় অত্যাচারীর অত্যাচারের অবসান কাম্য। বিদ্রোহী কবি উৎকণ্ঠ ঘোষণায় জানিয়ে দেন যে, উৎপীড়িত জনতার ক্রন্দনরোল যতদিন পর্যন্ত প্রশমিত না হবে ততদিন এই বিদ্রোহী কবিসত্তা শান্ত হবে না। এই চির বিদ্রোহী অভ্রভেদী চির উন্নত শিররূপে বিরাজ করবে!
১) ১৯৭২ সালে কার উদ্যোগে কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে এনে নাগরিকত্ব ও জাতীয় কবির স্বীকৃতি দেওয়া হয়? [ঢা.বো.২২]
২) ‘আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল’-এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে- [চ.বো.২২]
৩) ‘চির উন্নত মম শির’- কথাটি কীসের পরিচায়ক? [দি.বো.২২]
৪) ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি নিজেকে কার সূত হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন? [দি.বো.২৩]
৫) ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য’। চরণটিতে প্রকাশ পেয়েছে- [য.বো.২৩]
১) 'বিদ্রোহী' কবিতায় আত্মজাগরণে উন্মুখ কবির কীরূপ আত্মপ্রকাশ ঘোষিত হয়েছে?
২) ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ বলতে কোন সময়কে নির্দেশ করে?
৩) কবি অত্যাচারীর কোন জিনিস আর রণক্ষেত্রে দেখতে চান না?
৪) বিদ্রোহী' কবিতায় কবি কার বুকের ক্রন্দন-শ্বাস?
৫) 'একহাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-ত‚র্য'- এখানে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কোন সত্তাটি প্রকাশ পেয়েছে?
ক) কবি কোনো শাসকের অন্যায় আইন মানেন না। |
খ) ‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না'- একথা বলার কারণ সমাজে অবহেলিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের প্রতি কবির ভালোবাসা এবং তাদের অধিকার হরণকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি নিপীড়িত মানুষের পক্ষ নিয়ে অকল্যাণ, অসত্য ও সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। তিনি উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন। তিনি তাঁর বিদ্রোহী সত্তার শক্তিকে সকলের করে তুলেছেন। তিনি প্রশ্নোক্ত বাক্যটিতে অত্যাচারীর অত্যাচারের অবসান কামনা করেছেন। |
গ) উদ্দীপকের সঙ্গে 'বিদ্রোহী’ কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি হচ্ছে সংগ্রামী চেতনার দিক। যুগে যুগে বাঙালি জাতি নানাভাবে শোষণ-বঞ্ছনার শিকার হয়েছে। শাসকের শোষণ-নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তারা একসময় তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। শোষকদের প্রতিহত করতে গিয়ে তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। উদ্দীপকের কবিতাংশে সংগ্রামী চেতনার দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে যুগে যুগে জাতির সংকটকালে বিদ্রোহ-বিপ্লবের চেতনা নিয়ে স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু হয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। এই দিকটি ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় প্রতিফলিত কবির সংগ্রামী চেতনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি যেমন সদম্ভ আত্মপ্রকাশের কথা বলেছেন, উদ্দীপকের কবিতাংশেও সেই দিকটির প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি সগর্বে নিজের বিদ্রোহী কবিসত্তার প্রকাশ ঘটিয়ে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের শাসকদের শাসন ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন। তাদের শাসনের বিরুদ্ধে কবির যে ক্ষোভ ও বিদ্রোহ প্রকাশ পেয়েছে তা উদ্দীপকেও প্রতিফলিত হয়েছে। তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকের সঙ্গে আলোচ্য কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি হচ্ছে সংগ্রামী চেতনা। |
ঘ) “উদ্দীপকটি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সমগ্র ভাব ধারণ করে না।”- মন্তব্যটি যথার্থ। প্রকৃত বীর অন্যায়ের কাছে কখনো মাথা নত করেন না। পরাধীনতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার জন্য তিনি সংগ্রাম করেন এবং স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। উদ্দীপকে যুগে যুগে বিপ্লবীদের আগমনের কথা বলা হয়েছে। দেশ ও জাতির সংকটকালে যাঁরা এগিয়ে এসে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করেন তাঁরা ধূমকেতু সদৃশ। তাঁরা অন্যায়কারীদের নিশ্চিহ্ন করতে বিপ্লব করেন। তাঁরা অসত্য ও অকল্যাণ দূর করে সৃষ্টির নব-আনন্দ ধারা বইয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। উদ্দীপকের বিদ্রোহ-বিপ্লবের এই চেতনাটি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কবির বিদ্রোহী ও সংগ্রামী চেতনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। শাসকের গড়া আইন-কানুন ও নিয়ম-শৃঙ্খল ভাঙার তীব্রতা প্রকাশ পেয়েছে। “বিদ্রোহী' কবিতায় কবির নিজের বিদ্রোহী কবিসত্তা ব্যক্তি কবির নয়, তা জাতির ঐক্যশক্তির চেতনাসত্তা। এখানে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের শাসকদের শাসন ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দ্বারা নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ পেয়েছে। এ দিকটি উদ্দীপকের কবিতাংশে প্রকাশ পায়নি। উদ্দীপকে কেবল কবির সংগ্রামী সত্তার প্রকাশ ঘটেছে। এসব দিক বিচারে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ। |
ক) ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে। |
খ) আলোচ্য উক্তিটি দ্বারা কবি তাঁর নিরন্তর বিদ্রোহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ব্যাপারটি বুঝিয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি নিজের বিদ্রোহী কবিসত্তার প্রকাশ ঘটিয়ে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের শাসকদের শাসন ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেন। কবি অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। কবিতার শেষে ধ্বনিত হয় অত্যাচারীর অত্যাচারের অবসান। কবি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দেন যে, উৎপীড়িত জনতার ক্রন্দনরোলে প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর সংগ্রাম চলবেই। তাই তিনি বলেছেন, ‘আমি সেই দিন হব শান্ত।’ |
গ) মানুষের যথাযথ অধিকার প্রতিষ্ঠার দিক থেকে উদ্দীপক ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ভাবগত মিল রয়েছে। একজন দেশপ্রেমিক বীরের ধর্ম দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ করা, অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করা। বীর এই লক্ষ্যে শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ফলে তাঁর বিদ্রোহী চেতনায় জাতির আত্মজাগরণ ঘটে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি নিজের বিদ্রোহী কবিসত্তার পরিচয় দিলেও তা সমগ্র অত্যাচারিত ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠধ্বনি হয়ে উঠেছে। যেখানেই অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচার দেখেছেন, সেখানেই কবির বিদ্রোহী সত্তা জাগ্রত হয়েছে। উৎপীড়িত জনতার ক্রন্দনরোল প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বিদ্রোহ চলমান থাকবে। অর্থাৎ একটি সুন্দর বাসযোগ্য সাম্য-ভ্রাতৃত্বের সমাজ বিনির্মাণে কবি সদা তৎপর। উদ্দীপকের কবিতাংশে কবি পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের সামর্থ্যরে শেষ বিন্দু দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত জঞ্জাল সরাতে তৎপর। এ বিশ^কে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাসযোগ্য করে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কিছুটা ভিন্ন ধাঁচে হলেও একই রকম মনোভাব ফুটে উঠেছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কবি একটি অন্যায়-অত্যাচারমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে বদ্ধপরিকর। তাই বলা যায়, অধিকার প্রতিষ্ঠার দিক থেকে উদ্দীপক ও কবিতার ভাবগত মিল লক্ষ করা যায়। |
ঘ) ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও মানুষের যথাযথ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম উদ্দীপক ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ফুটে ওঠায় আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ। শোষিত, বঞ্চিত, অত্যাচারিত মানুষের মুক্তির সংগ্রাম যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। মুক্তির এই মহান সংগ্রামে কখনো একজন ব্যক্তির নেতৃত্বে পুরো সম্প্রদায় সংগ্রাম করেছে, আবার কখনো ব্যক্তিই তার মুক্তির জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি সব অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। কবিতার শেষে ধ্বনিত হয়েছে অত্যাচারীর অত্যাচারের অবসান কামনা, উৎপীড়িত জনতার ক্রন্দনরোল থেমে একটি সাম্য ও মৈত্রীর সমাজ বিনির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত কবির এ সংগ্রাম চলমান থাকবে। ফলে সমাজে মানুষের যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং সকলের সহাবস্থান নিশ্চিত হবে। উদ্দীপকের কবিতাংশে কবি একটি সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। যতক্ষণ কবির দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ তিনি প্রাণপণে পৃথিবীর জঞ্জালসমূহ সরাবেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে চান তিনি। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি সর্বপ্রকার অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার ও অনিয়মের অবসানকল্পে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর এ লড়াই অব্যাহত থাকবে। উদ্দীপকের কবি এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কবি উভয়েই একটি সুন্দর পৃথিবী বিনির্মাণে অঙ্গীকারবদ্ধ। তাঁরা মানুষের যথাযথ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্বকে যথাযোগ্য মানব বসতির আধার করতে চান। মানুষের মুক্তি বা মানবতার মুক্তিই তাঁদের উভয়ের লক্ষ্য। তাই বলা যায় যে, মানবমুক্তির আকাক্সক্ষাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ও উদ্দীপকের মূলসুর। |
ক) ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কবির ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। |
খ) কবি বিদ্রোহের বাণী ছড়িয়ে অপশক্তির প্রতিভূদের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন। পুরাণ মতে, দুর্বাসা অত্যন্ত কোপন-স্বভাব বিশিষ্ট একজন মুনি। অনেকেই তাঁর কোপানলে দগ্ধ হন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে শাপ দিয়ে ভস্ম করেন। তাঁর শাপে দেবরাজ ইন্দ্রও শ্রীভ্রষ্ট হন। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে দুর্বাসা অনেক সময় উন্মত্তের মতো কাজ করতেন। ফলে দেবতারা পর্যন্ত তাঁকে ভয় পেতেন। আলোচ্য কবিতায় কবি বিদ্রোহী হিসেবে অন্যায় ও অসাম্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যেই ‘আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য’ বলেছেন। |
গ) স্বাধীনতা অর্জনের চেতনার দিক থেকে উদ্দীপকের সাথে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সাদৃশ্য রয়েছে। পৃথিবীতে শোষক শ্রেণি সব সময় শাসিতদের প্রতি অবিচার করে। কিন্তু তাদের এই শোষণ রুখে দেওয়ার জন্য যুগে যুগে জন্ম হয়েছে অনেক প্রতিবাদী সত্তার। যারা অবিচারের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি স্বাধীনচেতা মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে সদম্ভ আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করেছেন। বিদ্রোহী সত্তার প্রকাশ ঘটানোর মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে কবি সমাজে শান্তি আনয়ন করতে চেয়েছেন। উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল যতদিন প্রশমিত না হবে, ততদিন কবির বিদ্রোহী সত্তা শান্ত হবে না বলে কবিতায় উল্লেখ করেছেন। উদ্দীপকে ক্ষুদিরাম বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে ভারতকে মুক্ত করতে চান। এজন্য স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আত্মবিসর্জন করেছেন। আর স্বাধীনতার এই চেতনা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কবির স্বাধীনতা চেতনারই প্রতিরূপ। |
ঘ) ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী মনোভাব ধারণ করায় উদ্দীপকের ক্ষুদিরাম এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কবি একই চেতনার ধারক তাই বলা যায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ। পৃথিবীতে শোষকদের অবিচার বেশিদিন স্থায়ী হয় না। তাদের ধ্বংস অনিবার্য। তাদের অনাচার সমূলে উৎপাটন করতে যুগে যুগে আবির্ভাব ঘটেছে অনেক মহাপুরুষের। তারা তাদের বিদ্রোহী সত্তা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবির সংগ্রামী চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি ব্রিটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি উৎপীড়িত মানুষের পক্ষ নিয়েছেন। তাদের ওপর অত্যাচারের অবসান ঘটাতে নিজেকে চিরবিদ্রোহী হিসেবে প্রকাশ দিয়েছেন। উদ্দীপকে ক্ষুদিরাম বসুর মধ্যে সংগ্রামী চেতনার প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি দেশের মুক্তির জন্য বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি আত্মবিসর্জন দিয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি বিভিন্ন ধর্ম, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও পুরাণের শক্তির উৎস থেকে উপাদান উপকরণ সমীকৃত করে নিজের বিদ্রোহী সত্তার অবয়ব রচনা করেছেন। তিনি চিরবিদ্রোহী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। কবিতার এই চেতনা উদ্দীপকের ক্ষুদিরামের মধ্যেও দেখা যায়। ক্ষুদিরামও দেশের মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। সেই বিবেচনায় বলা যায়, উদ্দীপকে প্রতিফলিত ক্ষুদিরামের সংগ্রামী চেতনাই যেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ভাবসত্যেরই সংহত রূপ। |
ক) ‘কুর্নিশ’ কথাটির মানে কিছুটা পিছিয়ে সম্ভ্রমপূর্ণ সালাম বা অভিনন্দন। |
খ) ‘‘শির নেহারি’ আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির’Ñ কথাটির মধ্য দিয়ে আত্মজাগরণে উন্মুখ কবির সদম্ভ আত্মপ্রকাশ ঘোষিত হয়েছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কবি বীর-ধর্মের অনুসারী। আত্মপ্রত্যয়ী বীরের চিত্ত সর্বদাই সমুন্নত। সংগত কারণে কবির এই বীরসত্তা কোনোকিছুই পরোয়া করে না; ধ্বংসের দামামা বাজিয়ে এগিয়ে যায় নতুন সৃষ্টির লক্ষ্যে। কবি মনে করেন, আত্মগৌরবে বলীয়ান তাঁর সেই সদম্ভ বীরোচিত রূপ অবলোকন করে হিমাদ্রি তথা হিমালয়ও যেন মাথা নত করে। প্রশ্নোক্ত চরণটির মধ্য দিয়ে এ বিষয়টিই ফুটে উঠেছে। |
গ) উদ্দীপকটি ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় অত্যাচারীর শাসন-শোষণ প্রতিরোধী চেতনার দিকটি নির্দেশ করছে। শাসকেরা অনেক ক্ষেত্রেই শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তবে সবাই সেই অন্যায়কে সহজভাবে মেনে নেয় না। কিছু কিছু সাহসী প্রাণ এসব অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি সমগ্রপ্রসারী বিদ্রোহের বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজের বিদ্রোহী কবিসত্তার প্রকাশ ঘটিয়ে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের শাসকদের শাসন ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম হন। কবি সকল অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে গিয়ে বিভিন্ন ধর্ম, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও পুরাণের শক্তির উৎস থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে নিজের বিদ্রোহী সত্তার অবয়ব রচনা করেছেন। সবচেয়ে অত্যাচারীর শক্তি নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি দ্রোহের ঘোষণা দিয়েছেন। উদ্দীপকে লাখো শহিদের আত্মত্যাগের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কথা বর্ণিত হয়েছে। বাংলার আকাশ থেকে হানাদারের কালো ছায়া সরিয়ে, হানাদার বাহিনীকে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে হারিয়ে আমরা বিজয় অর্জন করতে বাঙালি বদ্ধপরিকর। অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এই মানসিকতা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ছত্রে ছত্রে বিদ্যমান। কবি তাঁর কবিতায় সকল অত্যাচারী শক্তির অবসান কামনায় নিরন্তর বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। আর উদ্দীপকে কবিতার এ দিকটিই নির্দেশিত হয়েছে। |
ঘ) শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী রূপ ধারণ করায় উদ্দীপকটিতে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মূলভাবের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে বলে আমি মনে করি। শাসকেরা যখন শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন অনেক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় চারদিকে। এই পরিস্থিতিতে কতিপয় সাহসী প্রাণ তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আবার কেউ সকল প্রকার অন্যায়-অত্যাচার বিলীন না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিদ্রোহ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি তাঁর বিদ্রোহী সত্তার স্বরূপ প্রকাশ করেছেন। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে কবির জন্ম। সংগত কারণেই ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির করাল গ্রাসে ভারতবাসীর চরম দুরবস্থা তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। চারদিকে অন্যায়-অত্যাচার, যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে গোটা জাতি গুমরে মরছে! এমন প্রেক্ষাপটে বিরাজমান বৈষম্য ও অচলায়তনকে ঘোচাতেই বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন কবি।উদ্দীপকে দেখা যায়, শাসন আর শোষণের শৃঙ্খলে বন্দি জনতা সংগ্রামী হয়ে উঠেছে। তারা শাসকগোষ্ঠীর কোনো অত্যাচারে গুটিয়ে যায় না। অপশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী জনতা বজ্র হুংকারে মনের ভয় দূর করে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় বাংলা মাকে পাহারা দেয় তারা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব প্রকাশ করে বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়েছেন। দেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যেই তিনি উদ্দীপকের সংগ্রামী জনতার বিদ্রোহী সত্তাকে আকাক্সক্ষা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, দ্রোহই একদিন পরাধীন জাতিকে পৌঁছে দেবে মুক্তির সীমানায়। কবি দ্রোহের সঙ্গে সঙ্গে মানবপ্রেমকেও চেতনায় ধারণ করেছিলেন। আর এই প্রেম ও দ্রোহের মৌলিক প্রেরণা ছিল সর্বাঙ্গীণ মুক্তি, যা উদ্দীপকের বিদ্রোহী জনগণের জীবনাদর্শের মূল লক্ষ্য ছিল। তাই বলা যায়, উদ্দীপকটিতে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মূলভাবের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে। |